ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কালো পানিতে রঙিন স্বপ্ন : অমানবিক ও আলোকময় এক গল্প

কালো পানিতে রঙিন স্বপ্ন : অমানবিক ও আলোকময় এক গল্প

সভ্যতার চাকাকে সচল রাখতে যে কয়লা খনি দিন-রাত আলো উজাড় করে, তারই ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অন্ধকার স্রোতে মিশে আছে এক করুণ বাস্তবতা। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির বিষাক্ত, কালো ও উষ্ণ পানির ড্রেনে বুকসমান ডুবে শতাধিক নারী প্রতিদিন যে সংগ্রাম চালাচ্ছেন, তা শুধু জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা নয়- বরং চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার অদম্য লড়াই। তীব্র শীতের কামড় কিংবা বর্ষার অবিরাম ধারা- কোনো কিছুই এই মা ও বোনদের থামিয়ে রাখতে পারে না। দুনিয়াজুড়ে যখন বিত্তবৈভবের ঝলকানি আর যান্ত্রিক সভ্যতার জয়জয়কার, ঠিক তখন আমাদেরই চোখের সামনে একদল মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য বেছে নিতে হচ্ছে এই অমানবিক জীবন।

ভূগর্ভের বিষাক্ত বর্জ্য আর কয়লার ডাস্ট মিশ্রিত এই ময়লা পানিতে দীর্ঘক্ষণ ডুবে থাকার মাশুল তারা দিচ্ছেন নিজের শরীর দিয়ে। কোনো শ্রমিক সুরক্ষাব্যবস্থা নেই, নেই কোনো ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো। খনি কর্তৃপক্ষ যেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, সেখানে রক্ত পানি করা পরিশ্রমে অর্জিত দৈনিক কয়েকশ’ টাকাই এই অসহায় পরিবারগুলোর একমাত্র ভরসা।

তবে শরীরজুড়ে ক্ষত আর রোগের তীব্র যন্ত্রণা বয়ে নিয়েও এই মায়েরা হাসেন। কারণ, এই বিষাক্ত পানির গভীরেই তারা বুনে চলেছেন তাদের সন্তানদের জন্য এক একটি রঙিন স্বপ্নের বীজ। সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং মানবিক দিকটি হলো, এই নরকসম পরিবেশেও তারা কিন্তু হেরে যাননি; বরং বুকসমান পানিতে বুকভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের দিকে। কুলসুম বেগম, রিনা রানীর মতো মায়েরা স্বপ্ন দেখেন তার সন্তান একদিন বড় ডিগ্রি নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই নারীরা শুধু কয়লা সংগ্রহ করছেন না, তারা জীবনের আশা কুড়িয়ে নিচ্ছেন। তাদের ঘামে ভেজা প্রতিটি কয়লার কণা এই অন্ধকূপ থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছে।

এই মায়েদের আত্মত্যাগ ও লড়াই আমাদের শেখায় কীভাবে চরম অন্ধকার থেকেও আলোর স্বপ্ন দেখতে হয়। রাষ্ট্র ও খনি কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই নারীদের জন্য মানবিক শ্রমপরিবেশ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লড়াকু নারীদের স্বপ্নের যেন অকালমৃত্যু না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের পুরো সমাজের।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত